উত্তম ঋণের মূলনীতি [ Principles of Sound Lending ]

উত্তম ঋণের মূলনীতিঃ ঋণের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন ব্যাংক ব্যবসায়ের গোড়া থেকে অদ্যাবধি চলে আসছে। যে ব্যাংক যত সুষ্ঠু ভাবে ঋণ কার্যক্রম সম্পাদনে সক্ষম সে ব্যাংক ততবেশী দক্ষ ও মুনাফা অর্জনকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। দু’দশক আগেও ব্যাংক মুনাফার সিংহভাগ ঋণের মাধ্যমে অর্জিত হত।

কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ঋণ বহির্ভূত কার্যক্রম তথা সেবা উদ্ভাবন বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহ যথেষ্ট সচেষ্ট। ব্যাংক আমানতকারীদের টাকাই ঋণহিসেবে ঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। অবশ্য আমানতকারীদের চাহিদা পুরণের জন্য যথেষ্ট তারল্য সংস্থান করেই ঋণযোগ্য তহবিল নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

লাভের আশায় অপরের গচ্ছিত টাকা তৃতীয় ব্যক্তিকে প্রদান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ আবার আমানতকারীদের আমানতের জন্য সুদ দিতে হয় এবং তাদের আমানত সংক্রান্ত লেনদেন রক্ষার্থে যথেষ্ট ব্যয়ও হয়ে থাকে। ঋণ কার্যক্রম ঝুঁকি ও আয়ের পর্যায় ছাড়াও অন্যবিধ কয়েকটি আবশ্যকীয় বিষয় গুরুত্বের সংগে চনা ভিত্তিক পরিচালনা করতে হয়। সে সব নীতি সমূহের উপর ভিত্তি করে ঋণ কার্যক্রম সুষ্ঠু ও বাস্তব ভিত্তিক করা সম্ভব তার প্রধান কয়েকটি নিম্নে দেখা যেতে পারে।যেমন :

উত্তম ঋণের মূলনীতি [ Principles of Sound Lending ]

উত্তম ঋণের মূলনীতি [ Principles of Sound Lending ]

সুষ্ঠু নীতির উপাদান

গুনগত  উপাদান

১. উদ্দেশ্য

২. নিরাপত্তা

৩. সামাজিক দায়িত্ব

৪. ব্যবসায়ীক নৈতিকতা

৫. বিস্তৃতি ও ঝুঁকি বহু যাকরণ

৬. জাতীয় স্বার্থ

৭. আদায়ের সম্ভাবনা

পরিমাণ গত উপাদান

১. তারল্য

২. মুনাফা ও লাভ অর্জন

৩. ব্যবসায়িক স্বচ্ছলতা

৪. পর্যাপ্ত জামানত

উপরোক্ত সুষ্ঠু ঋণ নীতির উপাদান গুলোর সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা নিম্নে দেওয়া গেল :

উত্তম ঋণের মূলনীতি [ Principles of Sound Lending ]

গুণগত উপাদান-(Qualitative Factors) :

নিম্নে গুণগত উপাদানগুলো পর্যায়ক্রমে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হল :

১। উদ্দেশ্য-(Purpose of the loan) :

আবেদনকৃত ঋণের উদ্দেশ্য কি তা ব্যাংকের মূল কার্যক্রম তথা জানীতির বিরুদ্ধে কিনা তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক। এতদভিন্ন যে উদ্দেশ্যে ঋণের আবেদন করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে ঋণ গ্রহীতা আয় তথা অর্থাগমন ঋণ পরিশোধে সহায়তা হবে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক।

২। নিরাপত্তা- (Safety) :

আবেদনকৃত ঋণ বিতরণ করলে ঋণগ্রহীতার কাছে নিরাপদ থাকবে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা উচিৎ। ভাবী ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়ীক সুনাম ও লেনদেন গতিধারার ভিত্তিতে আবেদনকৃত ঋণের নিরাপত্তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা আবশ্যক।

৩। সামাজিক দায়িত্ব- (Social Responsibility) :

ব্যাংক যে এলাকায় কার্যরত সে এলাকার ঋণ চাহিদা পূরণ ব্যাংকের একটি সামাজিক দায়িত্ব। কার্যে আওতাভুক্ত ব্যাংক উপকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে সুনাম অর্জন করতে হলে সময়ে সময়ে ঋণ চাহিদা ছাড়াও অন্যবিধ সামাজিক ক্রিয়াকলাপে ভূমিকা রাখতে হয়।

৪। ব্যবসায়ীক নৈতিকতা- (Business Ethics)

ঋণ কার্যক্রম ব্যাংকের আয়ের প্রধান উপায় হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীক নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকান্ডের জন্য ঋণ প্রদান করা উচিৎ নয়। যথা : যৌন পল্লী বিনিয়োগ, মাদক ব্যবসায়, চোরা কারবারী ইত্যাদি ব্যবসায় ঋণ প্রদান করা উচিৎ নয়।

৫। বিস্তৃতি ও ঝুঁকি বহুধাকরণ (Spread and Risk Diversification) :

অণ আকর্ষনীয় লাভ জনকহলেও অল্প কয়েকজন ঋণ গ্রহীতার মধ্যে কেন্দ্রীভূত থাকা আশংকাজনক। সে কারণে ক্ষণের ঝুঁকি বিতরনের লক্ষ্যে এলাকা। পেশা ব্যবসায় ইত্যাদি ভিত্তিক ঋণ মিশ্রন কার্যক্রম অপেক্ষাকৃত বেশী নিরাপদ।

৬। জাতীয় স্বার্থ- (National Interest)

বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট তথা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, মুদ্রাস্ফীতি ও করনীতির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সরকার তথা ব্যাংক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ সমূহ যে ধরনের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে ব্যাংক ঋণ কার্যক্রম সে অগ্রাধিকার ভিত্তিক হওয়া উচিৎ।

৭ আদায়ের সম্ভাবনা ( Recovery Possibilty)

ঋণ পরিশোধ করার সম্ভাবনা সন্তোষজনক হলেই আবেদনকৃত ঋণ মঞ্জুর করা সংগত। কারণ আমানতকারীদের গচ্ছিত টাকা পুনঃঘূর্ণনে (Recycle) নিশ্চিত করার জন্য ঋণ আদায় সম্ভাবনা সন্দেহাতীত হওয়া আবশ্যক।

উত্তম ঋণের মূলনীতি [ Principles of Sound Lending ]

খ. পরিমাণগত উপাদান- Factors) :

নিম্নে পরিমানগত উপাদান সমূহ পর্যায়ক্রমে সংক্ষিপ্তাকারে আলোচিত হলো :

১। তারল্য-(Liquidity) :

আমানত ও তারলা একই সূত্রে গাঁথা। তারল্য নিশ্চিত না হলে বিদ্যমান। আমানত থাকবে না এবং নতুন আমানতও আসবে না। ঋণ যোগ্য তহবিল এমনভাবে ব্যবহৃত হওয়া উচিৎ যাতে ব্যাংকের তারল্য সংকটের সম্ভাবনা শূণ্য থাকে।

২। মুনাফা ও লাভজনকতা- (Profit and Profitability) :

অন্য সকল ব্যবসায়ের মত ব্যাংকেরও মূল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে সম্পদ সর্বাধীকরণ। ঋণের সুদ ও ঋণ আদায় সন্তোষজনক না হলে তহবিল ব্যয় তথা প্রশাসনিক ব্যায় নির্বাহ করে যথেষ্ট মুনাফা অর্জন সম্ভব নয়। আবার অধিক সুদ আরোপ করলে ঋণ গ্রহীতারা বিকল্প তহবিলের উৎস সন্ধান কল্পে ব্যাংক ছেড়ে চলে যেতে পারে। এহেন দ্বান্দ্বিক অবস্থা নিরসন অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার মাধ্যমে সম্ভব। দক্ষ কার্যক্রমের মাধ্যমে মুনাফা ঋণের মূল্য বাবদ অপেক্ষাকৃত বেশী হয় অথচ ঋণ গ্রহীতা ব্যাংকের প্রতি অনুরক্ত থাকবে এরূপ অবস্থা নিশ্চিত করে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা আবশ্যক।

৩। ব্যবসায়িক স্বচ্ছলতা – (Bussiness Solvancy) :

ব্যাংক একটি লাভজনক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হিসাবে ব্যবসায়িক সচ্ছলতা রক্ষা করতে হবে। একারণে প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ এমন অবস্থায় রাখতে হবে যাতে করে আমানতকারীদের জন্য রক্ষিত তারল্যতার ঘাটতি না হয়। অন্যদিকে ঋণের পরিমাণও পর্যাপ্ত থাকবে যাতে করে ঋণ গ্রহীতার চাহিদা মিটিয়ে মুনাফা অর্জন করতে পারে।

৪। পর্যাপ্ত জামানত-(Adequate Security) :

ব্যাংক প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে গৃহীত জামানত পর্যাপ্ত কিনা তা অবশ্যই পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। উল্লেখ্য যে বরাদ্দকৃত ঋণের বিপরীতে দ্বিগুণ বা তার বেশী গুণ অংকের জামানত হিসেবে রাখা বাঞ্চনীয়। কমপক্ষে এক গুণ তথা একলক্ষ টাকার বিপরীতে এক লক্ষ টাকার কম জামানত রাখা কোন ক্রমেই উচিৎ নয়। এতে ঋণ প্রদানে ব্যর্থ হলে ঋণের অর্থ আদায়ে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে ব্যাংকের সুষ্ঠু ক্ষণনীতি প্রণয়নকালে গুণগত উপাদান ও পরিমাণগত উপাদানসমূহ বিশেষ ভাবে বিবেচনায় আনতে হয়।

উত্তম ঋণের মূলনীতি [ Principles of Sound Lending ]

উপসংহার [ Conclusion ]

ঋণ কার্যক্রম সম্পাদনের জন্যই ব্যাংক তহবিল সংগ্রহ করে থাকে। আর তহবিল সংগ্রহের সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য প্রদত্ত ঋণের নিরাপত্তা বিধান আবশ্যক। ঋণ কোন অনুদান নয়, ঋণ কোন মূল্যহীন ধারণাও নয়, বরং ঋণ ফেরত পাওয়ার জন্য ফেরত দেয়ার যোগ্যতা আছে এমন ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে প্রদত্ত এক ধরণের আর্থিক সহায়তা বিশেষ। ঋণ যে রূপ প্রদানকারী ব্যাংকের লাভের একটি বড় উৎস, তেমনি ঋণ গ্রহীতার কাছেও ঋণ ব্যবসায়ের একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

অর্থ্যাৎ ঋণদাতা ও ঋন গ্রহীতা পারস্পারিক স্বার্থে ঋণ নামক ক্রিয়াকান্ডে স্বতস্ফূতভাবে অবতীর্ণ হয়ে থকে। যদিও এ স্বতস্ফূর্ততা ঋণ গ্রহণ করার সময় গ্রহীতার পক্ষে এত স্পষ্ট দেখা যায় পরিশোধ কালে তেমনি আন্তরিক নাও থাকতে পারে। সুষ্ঠু ঋণনীতি অবলম্বন করা ঋণদাতা ব্যাংকের জন্য আবশ্যক। কারণ ব্যাংকের স্বার্থ, ঋণগ্রহীতার স্বার্থ ও এমনকি ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের স্বার্থ সর্বাধিকরনের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ঋণনীতির ওপর ভিত্তি করে ঋণ কার্যক্রমে ব্রতী হওয়া।

ঋণের মূল্য তথা ঋণ থেকে অর্জিত লাভ অতি নিম্ন হলে ব্যাংকের ক্ষতি অপরপক্ষে, অতি উচচমূল্যে ঋণ প্রদান ভালো ঋণ গ্রহীতাকে নিরুৎসাহিত করে। অতএব ঋনমূল্য নির্ধারণ চতুর্দিক বিবেচনা করে ব্যাংক তথা ঋণ গ্রহীতা উভয়ের জন্য গ্রহণযোগ্য।

আরও পড়ুনঃ

 

মন্তব্য করুন