তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]

তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহঃ মুনাফা এবং তারল্যের সংঘাত কে এড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রথা ও নিয়ম কে গ্রহণ করা হয়েছে যা পরবর্তীতে তত্ত্ব রূপে বিবেচিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী তত্ত্ববিদদের মতে, তহবিল কে যথোপযুক্ত সম্পদের বিনিয়োগের মাধ্যমে তারল্য এবং মুনাফার মধ্যে সমন্বয় সাধন সম্ভব।

তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]

তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]

নিম্নে তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ আলোচিত হলো ঃ

(১) বাণিজ্যিক ঋণ তত্ত্ব – Commercial Loan Theory

১৮শ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে প্রথম বাণিজ্যিক ঋণ তত্ত্বের উদ্ভাবন হয়। এই তত্ত্ব অনুসারে, বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গুলোকে স্বল্পমেয়াদী ঋণ প্রদান করে যাতে তারা তাদের চলতি মূলধনের চাহিদা পূরণ করতে পারে। এই সমস্ত ঋণ মানুষের বিভিন্ন ধরণের চাহিদা যেমন : উৎপাদন, বণ্টন, যাতায়াত ইত্যাদি মেটাতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ব্যাংক দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের প্রতি কম আগ্রহ প্রকাশ করবে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদী বলতে যন্ত্রপাতি স্থায়ী ও চলতি মূলধন, বাড়ী নির্মাণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে অর্থায়ন না করা।

এই মতবাদের মূল যুক্তিহলো, স্বল্প মেয়াদী ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ব্যাংক লেনদেন করা যাতে করে ব্যাংক কখনই কু-ঋনের প্রভাবে পড়বে না। আর আমানতকারীদের চাহিদা মোতাবেক তারল্য রক্ষা করে ব্যাংক পরিচালনায় সহজ ও ঝুঁকি মুক্ত হয়। কারণ ব্যাংকের দ্রুততার সহিত স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগকৃত সম্পত্তি তারল্যে রূপান্তর করতে পারে।

সমালোচনা :

এই মতবাদ গ্রহণযোগ্য নয় কারণ এই ধরণের ঋণ শুধুমাত্র স্বল্প মেয়াদী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। এই কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়ার নানা ধরণের জটিলতা দেখা দেয়। এছাড়া বাণিজ্য প্রক্রিয়ায় নানা ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। এর ফলে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং খাতকরা ঋণ পরিশোধ ব্যর্থ হয়।

এই মতবাদ এইরূপ ধারনা পোষন করে যে, ঋণ খেলাপের সম্ভাবনা নেই কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থায় ব্যবসায় যখন অর্থনৈতিক উপাদান দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন খাতকগন অনিচ্ছাকৃত খেলাপের সম্মুখীন হয়। এছাড়া ব্যাংক যদি চাহিবামাত্র নতুন ঋণ (fresh loans) প্রদানে সক্ষম হয় সে ক্ষেত্রে খাতকরা ও স্বল্পমেয়াদী ঋণ পরিশোধে উদ্ভুদ্ধ হয়। কিন্তু এই মতবাদটি ঋণ প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করলেও কোন লোকসান ব্যতীত তারল্যকে কিভাবে সম্পদে রূপান্তর করা যায় সে ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা প্রদান করে না যা স্থানান্তরিত তত্ত্বে আলোচিত হয়েছে।

তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]

(২) স্থানান্তর যোগ্য তত্ত্ব (The Shiftability Theory)

ব্যাংকের তারল্য সম্পর্কিত স্থানান্তরযোগ্য তত্ত্বটি উদ্ভাবিত হয় ১৯১৮ সালে আমেরিকায়। এর প্রবক্তা হলেন এইচ, জি, মৌলটন (HG Moulton) এ তত্ত্ব অনুসারে তারল্য সম্পর্কিত সমস্যাটি সমাধানের জন্য ঋণের পরিপক্কতা (Maturity of Loans) বিবেচ্য নয় বরং সম্পদের স্থানান্তরের যোগ্যতা এখানে বিবেচ্য।

ব্যাংক কত তাড়াতাড়ি তার সম্পদ স্থানান্তর করতে পারে তা এখানে দেখা হয়, এখানে লক্ষ্যনীয় যে সম্পদ স্থানান্তরের সময় যে কোন মূলধন লোকসান না হয়। এ তত্ত্ব অনুসারে কোন সম্পদ কে সম্পূর্ণরূপে স্থানান্তরযোগ্য হতে হলে তাৎক্ষনিকভাবে অন্য সম্পদে রংপান্তরিত হবার বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে যাতে কোন রূপ মূলধন লোকসান ব্যতীত গ্রাহকদের তাৎক্ষনিক চাহিদা পূরনে সক্ষম।

যখন সমস্ত ব্যাংকিং সেক্টর তারল্য সমস্যার সম্মুখীন হবে তখন এ তত্ত্বটি প্রযোজ্য নয়। কারণ এ সময় একটি ব্যাংক তারল্য রক্ষার জন্য এরূপ সম্পদ সংরক্ষন করবে যার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে সাহায্য পেতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যা ঋণের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত। এখানে লক্ষ্যনীয় যে, ব্যাংক কোন সম্পদকে তরল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে গেলে প্রাথমিক ভাবে দৃষ্টি রাখবে যে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট তরল সম্পদ হিসেবে বিবেচ্য কিনা।

সমালোচনা

বানিজ্যিক ঋণ তত্ত্বের ন্যায় স্থানান্তরিত তত্ত্বটিও গ্রহনযোগ্য নয় কারণ ইহা নির্ভর করে সম্পদ কতখানি স্থানান্তর যোগ্য (যে সম্পদ ব্যাংক রাখা হয়) তার উপর। এছাড়া বাণিজ্যিক ঋণ তত্ত্ব ও স্থানান্তরের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র ব্যাংকের তারল্য এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার মধ্যে কোন দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা যায়নি। একথা ঠিক যে সম্পদ স্থানান্তরের মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র ব্যাংকের তারল্য কে উন্নীত করার ক্ষেত্রে অন্য ব্যাংকের তারল্য কে দুর্বল করতে হয়, তাই সকল ব্যাংক সম্মিলিত ভাবে পর্যাপ্ত পরিমান ঋণ যদি অনদায়ী দেনা হিসেবে থাকে সে ক্ষেত্রে তা অর্থনীতিতে কুপ্রভাব বয়ে আনবে।

৩. প্রত্যাশিত আয় তত্ত্ব – Anticipated Income Theory

১৯৪৪ সালে হার্বাট ভি. প্রোস্নাও (Hervert V Prachnow) প্রত্যাশিত আয় তত্ত্বটির উদ্ভাবন করেন। এ তত্ত্ব অনুযায়ী ঋণ গ্রহনকারী তার ঋণপরিশোধের তালিকাটি প্রত্যাশিত আয় অথবা নগদ অর্থ গ্রহনের সাথে সমন্বয় রেখে তৈরী করবে। এ তত্ত্বে মেয়াদী ঋণের উপর জোর দেয়া হয়েছে। একজন ব্যবস্থাপক সে সকল প্রকল্পের উপর নজর দেবে যেগুলো ভবিষ্যতে বেশী মুনাফা অথবা নিশ্চিত মুনাফা অর্জনে সক্ষম। সকল প্রকার ঋণ স্বল্প অথবা দীর্ঘ মেয়াদী তরল ঋণ হিসাবে বিবেচিত হয় যদি তা ঋণ গ্রাহকের পরিশোধের ক্ষমতার উপর বিবেচিত হয়ে প্রদান করা হয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতা ও ব্যাংকের এরূপ একটি চুক্তি হবে যে তার ভবিষ্যতে কি পরিমান আর্থিক লেনদেন সংগঠিত হবে, কি পরিমাণ মেশিনারীজ বা মজুদ পন্য বিরাজমান থাকবে। এক্ষেত্রে জামানতের উপর খুব বেশী গুরুত্বারোপ করা হয় না।

তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]

৪. দায় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব -Liability Management Theory

১৯৬০ সালের দিকে দায় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্বটি উদ্ভাবিত হয়। এটা তারল্য সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহের সর্বশেষ সংযোজন। ঐতিহ্যবাহী তত্ত্বগুলোতে সম্পদকে তরল সম্পদ হিসেবে সংরক্ষন করা হয়েছে কিন্তু এ তত্ত্বে সম্পদকে তরল হিসেবে সংরক্ষন করা অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়েছে কেননা যখন কোন ব্যাংক তহবিল সংকটের মুখোমুখি হয় তখন অর্থ বাজার থেকে ঋণপত্র বা অন্যবিধ দলিল বিক্রয় করে দায় সৃষ্টির মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

এ তত্ত্ব অনুযায়ী একটি ব্যাংক অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ব্যবহার করতে পারে।

(১) টাইম সাটিফিকেট ইস্যুর মাধ্যমে।

(২) অন্যান্য বাণিজ্যক ব্যাংক হতে ঋণ গ্রহনের মাধ্যমে

(৩) কেন্দ্রীয় ব্যাংক হইতে ক্ষণ গ্রহনের মাধ্যমে।

(৪) শেয়ার ইস্যু এবং সংরক্ষিত আয় হতে তহবিল সংগ্রহের মাধ্যমে।

(১) টাইম সার্টিফিকেট অফ ডিপোজিট

১৯৬০ সাল হতে আমেরিকায় স্বপ্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহের দায় ভিত্তিক তারল্যের সার্টিফিকেট অফ ডিপোজিট। টাইম সার্টিফিকেট সমূহ হস্তান্তরযোগ্য এবং বাজারে বিক্রয়যোগ্য। এই ” মাটিফিকেট সমূহ ১০ দিন থেকে ১ বছর মেয়াদী এবং ট্রেজারী বিল ও অন্যান্য অর্থ বাজারের দি (Instrument) সাথে প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার বহন করে।

(২) অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক হইতে ঋণ গ্রহন :

স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলোর দায় সৃষ্টির দ্বিতীয় উপায় হলো অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংক হতে ঋেতাদের সঞ্চিতির পরিমান বৃদ্ধি করা। অতএব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের বৈধ সঞ্চিতির বিনিময়ে জন ব্যাংক (যাদের অতিরিক্ত সঞ্চিতি আছে) থেকে ঋণ গ্রহণ করে। এ ধরনের ক্ষণ সাধারণত নিরাপত্তাহীন, এক দিনের জন্য প্রদান করা হয়।

(৩) কেন্দ্রীয় ব্যাংক হইতে ঋণ গ্রহণ

দায় সৃষ্টির মাধ্যমে সঞ্চিতির আরেকটি উৎস হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ। কেন্দ্রীয় তালিকাভুক্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলোকে তাদের দৈনন্দিন এবং মৌসুমভিত্তিক চাহিদা পূরনের জন্য বাই অগ্রিম প্রদানের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে থাকে।সাধারণত এ ধরনের ঋণ অন্যান্য ঋণের তুলনায় ব্যয়বহুল। সুতরাং এ ধরনের ঋণ বাণিজ্যিক ব্যাংকতখনই গ্রহণ করে যখন অন্য কোন উৎস হতে ঋণ গ্রহন করা সম্ভব নয়।

তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]

(৪) শেয়ার ইস্যু এবং সংরক্ষিত তহবিল হইতে ঋণ গ্রহণ :

সঞ্চিতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বিভিন্ন ধরণের শেয়ার ইস্যু করে থাকে যা বিনিয়োগকা চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এ ধরনের উৎস হতে তহবিল সৃষ্টি নির্ভর করে শেয়ারের উপর প্রদত্ত লভ্যাংশ। প্রবৃদ্ধির হারের উপর।

সমালোচনা

বাণিজ্যিক ব্যাংকের তারল্য সম্পর্কিত তিনটি তত্ত্বের মধ্যে প্রত্যাশিত আয় তত্ত্বটি অনেক গ্রহণযোগ্য এটি সমালোচনার উর্ধে নয়। বাস্তবত এ তত্ত্বটিতে তারল্য রক্ষার চেয়ে অধিকতর মুনাফার এ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতে যতই পূর্বানুমান করা হউক বাস্তবে তার উল্টা দেখা যেতে পারে। ফলে প্রত্যাশিত আয় তত্ত্বে ব্যাংকে খেলাপী তথা কু-ঋণের বাড়লে ভবিষ্যত ব্যাংকের তারল্যতার নাজুকে অবস্থা বিরাজ করবে। লক্ষ্যনীয় যে এ তত্ত্বে ঋণের ক্ষেত্রে জামানতের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়নি। অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায় দীর্ঘ মেসমূহে অধিকতর খেলাপী ঋণ সূচীত হয়।

আরও পড়ুনঃ

“তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত তত্ত্ব সমূহ [ Liquidity Management Theory ]”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন