সমস্যাগ্রস্ত/দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কিঃ সমস্যাগ্রস্থ ঋণ ব্যাংকের জন্য একটি রোগ বিশেষ। রোগ হলে যেমন রোগীকে ত্যাগ না করে সবাই রোগ সারানোর উদ্যোগ নিয়ে থাকে তদ্রূপ ব্যাংকের সমস্যাগ্রস্থতা চিহ্নিত করে উপযুক্ত সময়ে পদক্ষেপ গ্রহন করলে অনেক সমস্যাগ্রস্থ ঋণ কুঋণে পর্যবসিত হওয়া থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এ জন্য প্রয়োজন প্রথমে সন্তর্পনে ঋণ প্রাপ্ততা বিশ্লেষণ করা যাতে সঠিকগ্রাহকই ঋণের জন্য নির্বাচিত হতে পারে। সব গ্রাহক সর্তকতার সংগে নির্বাচন করলেও কোন কোন ঋণ গ্রাহকের ইচছায় বা অনিচ্ছায় সমস্যাগ্রস্থ হয়ে পড়তে পারে। নিয়মিত পুণনিরীক্ষণ ও ঋণ কার্য মনিটরিং সমস্যাগ্রস্থতার অনেক কারণ এড়াতে সহায়তা করতে পারে। পূর্বাহ্নে সমস্যা উন্মুখ ঋণ চিহ্নিত করা গেলে অধিকতর অবনতি থেকে ঋণকে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
Whoever takes a loan with the intention of not returning it, is a thief.
- Al-Hadith
সমস্যাগ্রস্ত/দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কি? [ What is Problem / Distressed Loans? ]
ব্যাংক ঋণকে সাধারণত দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যথাঃ আদর্শ ঋণ ও সমস্যাগ্রস্থ ঋণ। যে সব ঋণ ঋণ গ্রহীতা থেকে ফেরৎ পেতে কোন কষ্ট হয় না তাকে ব্যাংকের তরফ থেকে আদর্শ ঋণ বলে। অপরদিকে যে সব ঋণ পরিশোধ সারণী মোতাবেক আদায় হয় না সেগুলোকে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বলা যেতে পারে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ব্যাংকের ঋণ তহবিল ঋণ হিসেবে যতবেশী আবর্তিত (Recyceling] হবে ব্যাংক ততবেশী ঋণ কার্যক্রম হতে মুনাফা উপার্জন করতে সক্ষম হবে। ঋণের নিমিত্তে তহবিল আবর্তন ছাড়াও পরিকল্পিত তারল্য সংগ্রহে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে ব্যাংকের ঋণ আদায় হওয়া আবশ্যক। লেখকের মতে সমস্যা গ্রন্থ ঋণ বলতে বুঝায় :
“Problem Loans refer to those which the borrowers do not return as and when required inspite of repeated reminders and are not able to show any acceptable reasons for such failure অর্থাৎ সমস্যাগ্রস্থ ঋণ বলতে ঐ সব ঋণকে বোঝায় যা পুনঃ পুনঃ তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও ঋণগ্রহীতাগণ ফেরৎ দেয় না অথবা ফেরৎ না দেওয়ার যথাযোগ্য কারণও দেখাতে ব্যর্থ হন।
ব্যাংকের সব ঋণ যেমন আদর্শ ঋণ হিসাবে পরিগণিত হয় না তেমনি সব ঋণ সমস্যাগ্রস্থ নাও হতে পারে। অনেক ঋণ গ্রহীতাই ঋণ গ্রহণ কালে ফেরৎ দেয়ার সদিচ্ছা পোষণ করেন এবং তখন তার ফেরৎ দেয়ার ক্ষমতাও আছে বলে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু কালক্রমে ঋণ গ্রহীতার ইচ্ছা অথবা ক্ষমতা দুইটিই নেতিবাচক দিকে পরিবর্তিত হতে পারে যাতে সে/তারা সমস্যাগ্রস্থ ঋণ বলে পরিগনিত হয়। এছাড়া ইচ্ছা থাকা সত্বেও ক্ষমতা নেতিবাচক দিকে পরিবর্তিত হলেও অথবা ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ফেরৎ দেওয়ার ইচ্ছা পরিবর্তিত হলে প্রদত্ত ঋণ সমস্যাগ্রস্থ হতে বাধ্য।
এ অবস্থাটি নিম্নে দেখা যেতে পারে :
১। ঋণ ফেরৎ দেয়ার ইচ্ছা + ঋণ ফেরৎ দেওয়ার সামর্থ্য = আদর্শ ঋণ
২। ঋণ ফেরৎ দেয়ার অনিচ্ছা + ঋণ ফেরৎ দেওয়ার সামর্থ্য = সমস্যাগ্রস্থ ঋণ
৩। ঋণ ফেরৎ দেয়ার ইচ্ছা + ঋণ ফেরৎ দেওয়ার অসামর্থ্য = সমস্যাগ্রস্থ ঋণ
৪। ঋণ ফেরৎ দেয়ার অনিচ্ছা + ঋণ ফেরৎ দেওয়ার অসামর্থ্য = সমস্যাগ্রস্থ ঋণ নিম্নের চিত্রের মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কার ভাবে বোঝা যাবে :
[ ১৯৯৯ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো সব মিলিয়ে ঋণ নিয়েছে ৫৫ হাজার ৫১ কোটি টাকা। আর এই টাকার মধ্যে। খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ২০ হাজার ৭১১ কোটি ১ লাখ টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ব খাতের ৪টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ১টি বিশেষায়িত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৯ হাজার ২৪০ কোটি ১২ লাখ টাকা। বাকি ৪২ হাজার ৩৪১ কোটি ान টাকা খেলাপি ঋণ বেসরকারি ব্যাংকের এবং ১২৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিদেশি ব্যাংকের। ৪ টি অক্ষম বিশেষায়িত ব্যাংকের কথা বাদ দিলে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের। সোনালী ব্যাংকের মোট ঋণের ৫০ দশমিক ৯ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
অর্থ্যাৎ সোনালীর ১১ হাজার ৮৮৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ঋণের মধ্যে ৫ হাজার ১৫৪ কোটি ১৫ লাখ টাকাই খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে আবার ৪ হাজার ৭০৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকাই কুঋণ অর্থ্যাৎ এই অর্থ ফেরৎ পাবার তেমন কোন সম্ভাবনাই নেই। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থার খেলাপি ঋণ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকে ৭৮ দশমিক ৩২ শতাংশ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ৭১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং কৃ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
সুতরাং কৃষি ব্যাংক ছাড়া বাকি ৩টি বিশেষায়িত ব্যাংককে বাঁচিয়ে রাখার কি যুক্তি আছে তা সরকারকেই ঠিক করতে হবে। অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৪৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ রাপালী ব্যাংকের ৪৫ : দশমিক ৩২ শতাংশ এবং জনতা ব্যাংকের ৪১ দশমিক ২৮ শতাংশ। সব মিলিয়ে বলা যায় সরকারি ব্যাংকগুলোর অস্থিত্বই এখন চরম বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ]
আদর্শ ঋণ বনাম সমস্যাগ্রস্থ ঋণ [ Good Loans Vs Problem Loans ]
আদর্শ ঋণ সব ব্যাংকেরই কাম্য। অপরদিকে সমস্যাগ্রস্থ ঋণ অনাকাংখিত। এ ধরনের ঋণের ইতিপূর্বে কিছু পার্থক্য নির্দেশ করা হয়েছে। নিম্নের সারণীতে আদর্শ ও সমস্যাগ্রস্থ করে অধি পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
| ক্রমিক নং | পার্থক্যের বিষয় | আদর্শ ঋণ | সমস্যাগ্রস্থ ঋণ |
| ১ | অর্থ Meaning | সঠিক সময়ে পরিশোধিত | সঠিক সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ এবং খেলাপী চিহ্নিত |
| ২ | ঋণের পরিমাণ Quantum of Loans | সাধারণত সিংহভাগ | সাধারণত এক চতুর্থাংশের বেশী হয় না। |
| ৩ | পরিশোধ সারণী অনুসরণ Follow of Repayment Schedule | শতকরা ১০০ ভাগ অনুসরণ করা হয়, অনুমোদিত ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। | আংশিক অনুসরণ করা হতে পারে।এবং প্রায়শই সারণী পরিবর্তনে অনুমতি চাওয়া হয় না। |
| ৪ | মক্কেল ধরণ Nature of Clients | বেশীর ভাগই মর্যাদাশীল মক্কেল বৃন্দ | বেশীর ভাগই মর্যাদাশীল মক্কেল গন্ডি বহির্ভূত। |
| ৫ | মঞ্জুরী অনুকম্পাPartiality Sanction | নিয়মনীতি মেনে মঞ্জুর করা হয় | বেশীরভাগই আত্মীয় বন্ধু বান্ধব প্রভাবশালী ব্যক্তিদে সুপারিশকৃতদের অবজ্ঞা করে মঞ্জুর করা হয়ে থাকে। |
| ৬ | শর্তাদির ধরণ Nature of Terms. | প্রায়ণ গতানুগতিক অনুসরন যোগ্য | অনেক সময় নতুন ও কঠিন কষ্টসাধ্য শর্তাদি বেধে দেয়া হয়। |
| ৭ | ঋণ বিশ্লেষন ও সঠিক ঋণ Credit Analysis and Identification of Right Borrowers | পর্যাপ্ত ঋণ বিশ্লেষনের মাধ্যমে উপযুক্ত মক্কেল চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। | অপর্যাপ্ত ও অসঠিক ঋণ বিশ্লেষন হেতু অনুপযুক্ত মক্কেল চিহ্নিত হয়ে করা হয়ে থাকে। |
| ৮ | সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ Taking Bold Steps | সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ ব্যাংক উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে | রাজনৈতিক চাপ ঊর্ধ্বতন মহলের সরকারী পক্ষপাতিত্বের কারণে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। |
| ৯ | তদারকির নিবিড়তা Intensity of Supervision | সঠিক তদারকি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। | তদারকির অনুপস্থিতি অথবা লোক দেখানো তদারকি ব্যবস্থা |
| ১০ | জামানত Security | পর্যাপ্ত জামানত বিশ্বাসযোগ্য মর্কেল | অপর্যাপ্ত জামানত ও নির্ভরযোগ্য নয় এমন মর্কেল সংখ্যা বেশী। |
| ১১ | লাভ-ক্ষতি Profit-Loss | মুনাফা বৃদ্ধিকারী লেনদেন। | লোকসান বৃদ্ধিকারী লেনদেন |
| ১২ | যোগাযোগ Contact/Communication | পত্রালাপ, টেলিফোন ব্যক্তিগত বা অন্যকোন মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যাংকের সহিত সহযোগিতামূলক | পত্রালাপ টেলিফোন ব্যক্তিগত বা অন্যকোন মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপনে সহযোগিতার মনোভাব দেখায় না। |
| ১৩ | অর্থায়ন কাঠামো Financing Structure | ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের কাঙ্খিত ও ভারসাম্যপূর্ণ পুঁজি মিশ্রন। | ভারসাম্যহীন দীর্ঘমেয়াদী তথা স্থায়ী সম্পত্তি তথা অনাকাঙ্খিত ঋণ-মালিকী পুঁজি মিশ্রণ। |
| ১৪ | প্রাকৃতিক দুযোগ তথা বিরূপ অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া সহ্য করার ক্ষমতা কেটে Ability to stand effects natural calamities and adverse conditions economic | দূর্যোগ ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া উঠার পূর্বাহেই প্রস্তুত থাকে এবং এরূপ নেতিবাচক অবস্থার সম্মুখীন হলে সফলভাবে তা অতিক্রম করতে সক্ষম। | যেহেতু এরূপ প্রতিক্রিয়া কেটে উঠার জন্য পূর্বাহ্নে প্রস্তুত থাকে জন্য না সেহেতু এমনকোন নেতিবাচক অবস্থার মোকাবেলা করতে প্রায়শ হিমশিম খেয়ে ব্যর্থ হয়ে যায়। |
| ১৫ | আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা Need for taking legal actions | মত পার্থক্য দেখা দিলে বা পরিশোধ সারণী পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সম্ভাব রক্ষা করে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে ব্যাংক 13 ঋণগ্রহীতা একমত হয়ে ‘সিদ্ধান্তে পৌঁছান এবং নিরসনকল্পে আলাপ আলোচনাই যথেষ্ট হয়। কোন প্রকার আইন আদালত করা প্রয়োজন হয় না। | এরা আলাপ আলোচনা করতে আসেনা বিধায় আইন আদালত ও মামলা মোকদ্দমা ছাড়া ব্যাংকের কোন বিকল্প থাকে না। |
আরও দেখুনঃ
“সমস্যাগ্রস্ত/দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ কি? [ What is Problem / Distressed Loans? ]”-এ 1-টি মন্তব্য