ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ [ Board of Directors of Bank ]

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ [ Board of Directors of Bank ] : ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা সফল হলে ব্যাংকের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যথা শেয়ার হোল্ডারগণ, আমানতকারীগণ, ঋণ গ্রহীতাগণ তথা সরকার ও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষসমূহ সন্তুষ্ট থাকে।

সফল ব্যবস্থাপনার জন্য চাই যোগ্য ও উপযুক্ত পরিচালনা পর্ষদ। বিক্ষিপ্ত শেয়ার হোল্ডারগণ সংখ্যায় অনেক হওয়ার কারণে ও দূরে দূরে অবস্থান করার কারণে তাদের পক্ষে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে পরিচালক পর্ষদ (Board of Directors) ব্যাংকের কার্যক্রম দক্ষ ভাবে চলছে কিনা তা দেখেন এবং সমস্যার সমাধান করেন। ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডারদের পক্ষে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বার্ষিক সভার মাধ্যমে এরূপ পরিচালক মন্ডলী নির্বাচিত হয়ে থাকেন।

 

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ [ Board of Directors of Bank ]

 

ব্যাংক পরিচালনায় যে সমস্ত প্রতিনিধি নির্বাচিত হন তাদেরকে সামগ্রিক বা সমষ্টিগতভাবে পরিচালক মন্ডলী বা পরিচালনা পর্ষদ বলা হয়। ব্যাংক পরিচালনার সার্বিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়। এরা সমষ্টিগতভাবে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ব্যাংকে প্রয়োগ করে থাকে। মোট কথা, পরিচালনা পর্ষদ বা Board of Directors ব্যাংক পরিচালনার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। শেয়ার মালিকগণ তাদের সাধারণ বিশেষ বা অতিরিক্ত সভায় মিলিত হয়ে কেবল ব্যাংকের মূলনীতি ও পরিকল্পনা স্থির বা অনুমোদন করে থাকেন।

ব্যাংক যদি নতুন ও আকৃতিতে ছোট হয় সেক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালকরাই সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করে থাকেন। কিন্তু ব্যাংকের আকার আয়তন বৃহৎ হলে পরিচালকদের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়। না। সেরূপ ক্ষেত্রে ব্যাংকের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য পরিচালকমন্ডলীর অধীনে একজন প্রধান কার্যনির্বাহী বা Chief Executive কোথাও কোথাও Executive President Managing Director বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি পরিচালক মন্ডলীর কর্তৃক নির্ধারিত কর্মপন্থা ও নীতিগুলো যথাযথভাবে কার্যে পরিণত করে থাকেন। তার পক্ষে সমুদয় কাজ সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয় না বিধায় তিনি তার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের কিছুটা ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের উপর অর্পন করে থাকেন। এভাবেই ব্যাংকের কার্যাবলী সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন হয়ে থাকে।

একটি মধ্যম শ্রেণীর বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাংগঠনিক কাঠামো পরবর্তী পৃষ্ঠায় চিত্রিত হল। ব্যাংকের আকার আয়তন ভেদে এর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হতে পারে।

“ব্যবসায়ের আত্মা হচ্ছে তৎপরতা”।

-চেষ্টার ফিল্ড

Table of Contents

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ গঠন  [ Composition of Bank Board of Directors ]:

ব্যাংকের সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে দক্ষ পরিচালনা পরিষদ গঠন একান্ত আবশ্যক বিভিন্ন উপায়ে পরিচালক নিয়োগ করা যেতে পারে। নিম্নে বিভিন্ন পদ্ধতির অবতারণা করা হল।

১। প্রবর্তক দ্বারা নিয়োগ

২। শেয়ার মালিক দ্বারা নিয়োগ

৩। পরিচালক মন্ডলী দ্বারা নিয়োগ

৪। তৃতীয় পক্ষ দ্বারা নিয়োগ ও

৫। সরকার কর্তৃক নিয়োগ |

একটি ব্যাংক কতজন পর্ষদ সদস্য নিয়ে গঠিত হবে তার কোন ধরা বাঁধা নিয়ম নেই। ব্যাংকের আকার, আয়তন ও প্রাথমিক প্রবর্তক বা Promoter দের পরিকল্পনা বা দূরদর্শিতা পরিচালনা পর্ষদের আকার নির্দেশ করে থাকে। তদভিন্ন পরিচালকগণ কোন কোন ব্যাংকে দু’রকমের হতে পারে। যথাঃ পূর্ণকালীন ও খন্ডকালীন। খন্ডকালীন পরিচালকগণ প্রয়োজনে পূর্বনির্ধারিত সময়ে এজেন্ডা ভিত্তিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। অপর পক্ষে পূর্ণকালীন পরিচালকবৃন্দ যদিও বেতন ভূক্ত কর্মচারী কর্মকর্তা নন তথাপিও ব্যাংকের প্রয়োজনে বিশেষ দায়িত্ব পালন করে থাকেন এবং এর জন্য সম্মানী বাড়ীভাড়া, মিটিং ফি ইত্যাদি পেয়ে থাকেন।

কোন কোন দেশে একজন পরিচালক নির্দিষ্ট সংখ্যার অধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে পারে না। অধিকন্তু জাতীয়করণকৃত ব্যাংক সমূহের বা রাষ্ট্রের শেয়ার বিদ্যমান এমন ব্যাংকের পরিচালক বৃন্দ নিয়োগে সরকারের সিদ্ধান্ত প্রবল থাকে। কোন কোন সময় ব্যাংকের ভিতর অথবা বাহির থেকে বিশেষজ্ঞদেরকেও পরিচালক হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়ান্তে বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহের পরিচালকের উর্ধতন ও নিম্নত্তর সংখ্যা থাকে। উল্লেখ্য যে আমেরিকায় এইরূপ পর্বদের সংখ্যা নুন্যতম পাঁচ এবং সর্বোচ্চ পঁচিশ হয়ে থাকে।

 

ব্যাংকের পরিচালকের যোগ্যতা ও নির্বাচন [ Qualification and Election of Directors ]:

সাধারণত ব্যাংকের প্রথম পরিচালক কমবেশী স্ব-নির্বাচিত অর্থাৎ পরিমেল নিয়মাবলী ও স্মারকলিপিতে পরিচালক হিসেবে তাদের নাম উল্লেখিত থাকে। যদি পরিমেল নিয়মাবলীতে পরিচালক হিসেবে কারো নাম উল্লেখিত না থাকে তাহলে যারা স্মারক লিপিতে স্বাক্ষর করেছেন তারাই প্রথম পরিচালক বলে গণ্য হন। তারা প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা পর্যন্ত ঐ পদে বহাল থাকেন।

পরবর্তীকালে শেয়ার মালিকগণ ব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভায় মিলিত হয়ে পরিচালক নিয়োগ করেন। যেহেতু লিখিত সম্মতির মাধ্যমে পরিচালক পদ নিতে হয়, তাই চুক্তি সম্পাদনের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন। যে কোন সুস্থ, সবল ঋণ পরিশোধে সক্ষম ব্যক্তি যোগ্যতামূলক শেয়ার (Qualifying) কিনে ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন। নির্বাচিত হবার সময় যোগ্যতা সূচক শেয়ার গ্রহণ না করলে নির্বাচিত হবার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা নিতে হবে নতুবা এইরূপ পরিচালক পদচ্যুত হন।

 

 

ব্যাংকের পরিচালকদের শপথ গ্রহণ [ Oath of Bank Directors ]:

ব্যাংক যেহেতু সাধারণ জনগোষ্ঠীর আমানত গ্রহণ করে থাকে সেহেতু একটি দেশের সরকার আমানত যাতে নিরাপদ থাকে এরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন। এরূপ পদক্ষেপের মধ্যে একটি হল জাতীয় ভিত্তিক ব্যাংকের পরিচালকবৃন্দ তাদের উপর বর্তিত ব্যাংকের কার্যকলাপ, সর্বোচ্চ সততা, দক্ষতা ও বিশ্বাস সহকারে দায়িত্ব পালন প্রভৃতি শপথ গ্রহণের মাধ্যমে অঙ্গীকার করে থাকেন।

পরিচালকদের এরূপ শপথ গ্রহণ রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় নয় বরং ব্যাংক সমূহের দ্বারা গঠিত ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের সংবিধান দ্বারা পরিচালিত একটি বিধান। ব্যাংক পরিচালক পর্ষদের সাহায্যে আমেরিকান কমপট্রোলার অব কারেনসি (American Comptroller of Currency) কর্তৃক জাতীয় ব্যাংক পরিচালকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নামক পুস্তিকা প্রকাশ করে থাকে।

নিম্নে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন কর্তৃক দায়িত্ব গ্রহণ কালে ব্যাংক পরিচালককে যে ভাষায় শপথ গ্রহণ করতে হয় তা নিম্নরূপ :

I the undersigned, Director of the [bank] located at [address] being a citizen of the United States, and a resident of the state of [insert], so solemnly [affirm] that I will, go for as the duty developes on me, diligently and honestly administer the affairs of said Association, that I will not knowingly violate, or willingly permit to be violated any of the status of the United States under which this association has been organized and that I am the owner,

in good faith and in my own right of the number of shares of stock of the aggregate per value required by said status, subscribed by me as standing in my name on the books of the said associations; and that the same is not hypothecated or in any way pledged as security for any loan or debt..

 

 

ব্যাংকের পরিচালকের ক্ষমতা [ Powers of the Directors ]:

ব্যাংকের আকার ও আয়তন ভেদে পরিচালকদের ক্ষমতা নির্ভর করে। অর্থাৎ যদি ব্যাংকটি ক্ষুদ্রাকার হয়ে থাকে তাহলে পরিচালকরা ব্যাংকের সব ঋণ বিনিয়োগ ও অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবেন এবং তার সুষ্ঠু সুরাহা করবেন। ব্যাংকের ব্যাপকতা অনেক বৃহদাকার হলে সেক্ষেত্রে পরিচালকরা চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সে মোতাবেক কার্য সম্পাদনের পরামর্শ দিবেন। সাথে সাথে ব্যাংকের অন্যান্য কমিটি ও কর্মকর্তার নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন যাতে উক্ত ক্ষমতাধারী ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ বিচার করে তাদের উপর অর্পিত কার্য সমূহের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

কিন্তু ব্যাংক তদারকি দায়িত্ব পরিচালকবৃন্দ হস্তান্তর করতে পারেন না। শর্তব্য যে, পরিমেল নিয়মাবলী চার্টার বা ব্যাংক আইন প্রদত্ত পরিচালকদের দায়িত্ব হস্তান্তর যোগ্য নয়। পরিমেল নিয়মাবলীতেই সাধারণতঃ ব্যাংক পরিচালকদের ক্ষমতা সীমারেখা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে এবং তাই এটা ব্যাংক পরিচালকদের জন্যে বৈধ ক্ষমতা বলে বিবেচিত নিম্নে কয়েকটি বিশেষ ক্ষমতার যা ব্যাংক পরিচালকরা ব্যবহার করতে পারেন তা উল্লেখ করা গেল :

১। শেয়ার মালিকদের কাছে শেয়ার বাবদ অর্থ তলব করা।

২। ব্যাংকের অর্থ বিনিয়োগ করা।

৩। ব্যাংক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সাধারণ নীতি প্রণয়ন।

৪। পরিচালকের অকাল মৃত্যু বা ইস্তফা প্রদান বা পদচ্যুত হলে তার অসমাপ্ত সময়ের জন্য এক বা একাধিক পরিচালক নিয়োগ।

৫। প্রধান নির্বাহী নিয়োগ করা।

৬। পরিচালক মন্ডলীর সভাপতি নিয়োগ করা।

৭। হিসাবপত্রের পরিদর্শন করা।

পরিচালকদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ [ Directors Indemnifications ]:

পরিমেল নিয়মাবলীতে উল্লেখিত ভাবে পরিচালকরুদ্ধ তাদের দ্বারা ব্যাংকের জন্য ব্যয়িত বা তাদের জন্য প্রাপ্য খরচ সমূহ ব্যাংক থেকে গ্রহণ করতে পারবেন। যেখানে পরিমেল নিয়মাবলীতে উল্লেখ না থাকে এরূপ বা অন্য কোন খরচ যা পরিচালকদের প্রাপ্য তা বার্ষিক শেয়ারহোল্ডারদের সভায় অনুমোদন সাপেক্ষে পরিচালক বৃন্দ গ্রহণ করতে পারবেন।

অধিকন্তু ব্যাংক পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে খরচকৃত মামলা মোকদ্দমার ব্যয় চূড়ান্ত ভাউচার দেয়ার অঙ্গীকার আগাম অথবা খরচ করা হয়ে থাকলে সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে গ্রহণ করার অধিকার পরিচালকবৃদ্ধের রয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনকালে বড় ধরনের অবহেলা, ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ ফৌজদারী (Criminal) ক্রিয়া কান্ডের জন্য পরিচালকগণ ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলে এরূপ বর্ণিত নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।

পরিচালকদের ব্যক্তিগত গুণাবলী [ Personal Attributes of Successful Bank Directors ]:

ব্যাংক আমানতকারী ও তহবিল ব্যবহারকারীর মধ্যে যোগসূত্র রচনা করে বিশ্বাসের ভিত্তিতে ব্যবসায় করে থাকে। পরিচালকবৃন্দ ব্যাংকের প্রতিতু পরিচালক বৃন্দ ও ব্যাংক প্রায়শঃ অবিচ্ছেদ্য সুনামে অবস্থান করে। ব্যক্তিগত সুনাম-বিশিষ্ট পরিচালকবৃন্দ তাদের দ্বারা পরিচালিত ব্যাংকের সুনাম বৃদ্ধি করে থাকেন। অপর পক্ষে সুনাম-বিশিষ্ট ব্যাংকের পরিচালক হয়ে ব্যক্তিবর্গের সুনাম বৃদ্ধি পাওয়াও বিচিত্র নয়। ব্যাংক প্রায় একটি গণসেবা প্রতিষ্ঠান বিধায় পরিচালকবৃন্দের সততা, দক্ষতা ও বিশ্বস্ততা এবং সর্বোপরি উচু মানের নৈতিক

চরিত্রের অধিকারী পরিচালকবর্গ ব্যাংকের অমূল্য সম্পদ। একটি ব্যাংকের আদর্শ পরিচালকবৃন্দের যে যে ব্যক্তিগত গুণাবলী আবশ্যক তার প্রধান কয়েকটি নিয়ে ইঙ্গিত করা গেল :

(ক) সফল পরিচালককে অবশ্যই অগ্রগামী চিন্তাধারী ও প্রগতিশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়। এককথায় প্রগতিশীল পরিচালকবৃন্দ সময়ের প্রয়োজনে আগাম সংবাদ রাখবেন এবং তজ্জন্য যথোপযুক্ত আগামী প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন।

(খ) সফল পরিচালককে সমাজে পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হতে হয়।

(গ) সফল পরিচালক সমাজ এবং তদঅন্তর্গত ব্যাংকমনা লোকদের পছন্দ অপছন্দ তথা চাহিদার বা রুচির প্রতি সমাকভাবে অবগত থাকেন।

(ঘ) সফল ব্যাংক পরিচালককে নব নব ব্যাংক সেবা উদ্ভাবন করে ব্যাংকের সেবা পরিধি বাড়ানোর ক্ষমতা থাকতে হবে।

(ঙ) ব্যাংকের পরিচালকদের মুদ্রা, করনীতি তথা নিজস্ব ব্যাংকের কর্মপন্থা পরিবর্তন বা পরিবর্ধন মক্কেলদের প্রতিক্রিয়া আগাম আঁচ করে ইতিবাচক পরিবর্তনে উদ্দ্যোগী হতে হবে।

(চ) সফল ব্যাংক পরিচালককে অবশ্যই ব্যাংক কার্য আওতা ছাড়াও দেশী ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনে সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে।

উপরোক্ত প্রধান গুণাবলী ছাড়াও ব্যাংক পরিচালককে সফল হতে হলে নিম্নোক্ত অতিরিক্ত গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে।

(১) শৃঙ্খলা বোধ

(২) কৌশল

(৩) ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা

(8) আশাবাদী

(৫) পরিবর্তিত অবস্থা বা পরিবেশের সাথে মিশতে পারার ক্ষমতা

(6) নিষ্ঠা

(৭) দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা

(৮) চট করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষমতা

(৯) মানসিক ভারসাম্যতা

(১০) পক্ষপাতহীন ন্যায্য বিচারের মনোভাব ও ব্যক্তিত্ব

(১১) আইন ও নিয়ম মাফিক কাজ সম্পাদনের প্রতি দৃঢ় মনোভাব

(১২) ব্যাংকের কর্মী বাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ও

(১৩) কর্মচারীর সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করার ক্ষমতা

 

Pubali Bank HQ

 

ব্যাংক পরিচালকদের দায়িত্ব [ Responsibilities of the Bank Directors ]:

একটি ব্যাংকের সফলতা ও ব্যর্থতার চুড়ান্ত দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের উপরই বর্তায়। পরিচালকদের নিয়োগ অথবা নির্বাচিত করা হয় শেয়ার হোল্ডার, আমানতকারী ও অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ন্যায্য সেবা বা পাওনা নিশ্চিতের লক্ষ্যে পরিচালকবৃন্দ ব্যাংকের স্বার্থে সময় সময় অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন, যার উদ্দেশ্য কার্যক্রম বাস্তবায়নের পূর্বে বিশ্বস্ততার সহিত গোপন রাখা ব্যাংক পরিচালকদের অন্যতম নৈতিক দায়িত্ব।

পরিচালকরা অনেক সময় ব্যাংক ছাড়াও তাদের অন্যান্য ব্যবসায় বা সামাজিক ক্রিয়াকান্ডে ব্যস্ত থাকেন তদ্‌সত্বেও পরিচালক হিসাবে তাদের নিয়োগ হাল্কা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। শত ব্যস্ততার ভিতরেও সকল পরিচালককে ব্যাংকের প্রয়োজনে ডাকা, পর্বদ সভায় হাজির হয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা উচিৎ।

পরিচালক হিসাবে সামাজিক মর্যাদা, আত্মতৃপ্তি, ভাতা বা সম্মানী পাওয়া পরিচালকদের জন্য সন্তুষ্টির কারণ হলেও অর্পিত দায়িত্ব অবহেলার জন্য ব্যাংকের তথ্য মক্কেলদের ক্ষয়ক্ষতি হলে এর দায়িত্ব এড়ানো পরিচালকদের পক্ষে সম্ভব হয় না। অসতর্কতা বা অবহেলার কারণে, ইচ্ছাকৃত এমনকি অনিচ্ছাকৃত ভাবে ব্যাংক তথা ব্যাংকের অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বর্গের সংগঠিত ক্ষয় ক্ষতির জন্য দেশে বিদেশে অল্প সংখ্যক হলেও কিছু কিছু পরিচালককে ফৌজদারী মামলায় অভিযুক্ত হতে দেখা গেছে।

Performance of one’s duty should be independent of public opinion.

– Mahatma Gandhi.

পরিচালকদের সাধারণত যে সকল ব্যক্তিবর্গের অধিকার তথা ন্যায্য পাওনার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয় তাদের কয়েকটি নিম্ন রূপ:

১। আমানতকারী গণ

২। শেয়ার মালিকগণ,

৩। কেন্দ্রীয় ব্যাংক,

৪। কর কর্তৃপক্ষ।

৫। সরকার

৬। সমাজ

উল্লেখিত গ্রুপ সমূহের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রতি পরিচালকদের দায়িত্বের ইঙ্গিত নিম্নে প্রদান করা হল

 

১. আমানতকারীগণ (Depositors):

ব্যাংক তহবিলের সিংহ ভাগ আমানতকারীরা যোগান দিয়ে থাকেন। আমানতকারীগণ অসন্তুষ্ট হলে তাদের আমানত অন্য ব্যাংকে সরিয়ে নেওয়ার আশংকা থাকে। সুতরাং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ করা এবং তাদের প্রাপ্য সেবা উত্তম রূপে সম্প্রসারণ করা পরিচালকদের একান্ত দায়িত্ব।

যেভাবে এরূপ উত্তম সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব তার কয়েকটি নীচে ইঙ্গিত করা হলঃ আমানতকৃত অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

  • টাকা উত্তোলনের নিমিত্তে চেক দেয়া মাত্র প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা।
  • কাউন্টারে উত্তম সেবা প্রদান।
  • দক্ষ সেবামুখী কর্মকর্তা, কর্মচারী নিয়োগ।

 

২. শেয়ার মালিকগণ (Shareholders):

পরিচালকবৃন্দ শেয়ার হোল্ডারদেরই প্রতিনিধি। বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ার হোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে তাদেরকে নির্বাচিত করা হয়ে থাকে। পরিচালকরণ শেয়ার হোল্ডারের পক্ষে নিম্ন বিষয়ের উপর দৃষ্টি রাখবেন বলে প্রত্যাশিত।

  • অন্য ব্যবসায় মালিকদের মত ব্যাংকের শেয়ার হোল্ডারগণও যাতে ন্যায্য লভ্যাংশ পান সেদিকে দৃষ্টি রাখা।
  • ব্যাংকের সুনাম বৃদ্ধি পায় এমন উদ্ভাবনী নতুন দিগন্তের উন্মোচন করা।
  • ব্যাংকের অভ্যন্তরে ব্যাংকের সংগে সম্পৃক্ত গোষ্ঠীর সংঙ্গে শেয়ারহোল্ডারদের পক্ষে সফল নেতৃত্ব প্রদান করা।
  • ব্যাংকের কর্মী বাহিনী লাভজনকভাবে সেবা বিক্রয় করতে পারে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
  • ভবিষ্যৎমুখী লাভজনক চিন্তা চেতনার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা।

 

৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Central Bank):

কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি দেশের ব্যাংকগুলোর মুরুব্বী ও প্রদর্শক। একটি দেশের সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমেই ব্যবস্থাকে বিশেষ করে বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহকে বৃহত্তর জনস্বার্থে নিয়ন্ত্রণ থাকে। ব্যাংক পরিচালকদের থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশার কয়েকটি নিম্নরূপ:

  • দেশে প্রচলিত ব্যাংক ব্যবসায় বিধি-বিধান সর্বোপরি দেশের সংবিধান মেনে ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দিষ্ট বিষয়ে কাংখিত মেয়াদান্তে প্রদেয় বিবরণী সমূহ যথা সাপ্তাহিক বিবরণী, মাসিক বিবরণী ত্রৈমাসিক বিবরণী ও অর্ধবার্ষিক বিবরণী নিখুঁত ভাবে প্রস্তুত ও সার্বিক সময় তা দাখিল করা।
  • কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল ব্যাংকের কার্যক্রম পরীক্ষা করে তাদের দ্বারা চিহ্নিত ত্রুটি-বিচ্যুতি শোধরানোর জন্য সুপারিশকৃত পদক্ষেপ সমূহ বিশ্বস্ততা ও দরদ সহকারে বাস্তবায়ন করা।
  • বারবার তাগাদা সত্ত্বেও পরামর্শ অবহেলার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সভা সহকারে মেনে নেওয়া।

৪. কর কর্তৃপক্ষ (Tax Authority) :

দেশের প্রচলিত রাজস্ব নীতি বাস্তবায়নে কর কর্মকর্তাদেরকে বিশ্বস্ততার সাথে সহায়তা করা ব্যাংকের একান্ত দায়িত্ব। রাজস্বনীতি অনুযায়ী যে যে অর্থাগমন বা লাভের উপর ব্যাংক কর্তৃক কর বা ডিউটি প্রদেয় তা আদায়করণে কর তাদের স্বতস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করা পরিচালকদের নৈতিক দায়িত্ব। কোন কোন সময় ব্যাংক মক্কেলদের থেকে উৎস কর আদায়ে রাজস্ব কর্তপক্ষকে সহায়তা করতে পারে। সময় সময় করদাতা মক্কেলদের কর কর্তৃপক্ষের নিকট কর বিবরণী দাখিল করতে হয়। তথ্য সমূহের সত্যতা যাচাই করনের ব্যাপারে গোপন তথ্য সরবরাহের মাধ্যমে কর কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা প্রদান করতে হয়।

৫. সরকার (Government/Govt.)

ব্যাংক একটি দেশের অর্থনৈতিক ক্রিয়াকান্ডের বলিষ্ঠ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে থাকে। দেশের দীর্ঘ মেয়াদী অথবা সার্বিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঋণ সরবরাহ বাড়িয়ে বা কমিয়ে ব্যাংকসমূহের পরিচালক সরকারকে সক্রিয় সহযোগিতা করতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে রপ্তানীমুখী ক্রিয়াকান্ড, পশ্চাৎপদ গোষ্ঠীর আর্থিক উন্নয়নের নিমিত্তে আয় বর্ধক ক্রিয়া-কান্ড, খাদ্য শস্য উৎপাদন অথবা রপ্তানী মুখী স উৎপাদনে সরকারের গুরুত্বের নিরিখে ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রমের ভারসাম্য রক্ষা (পরিবর্তন) করে ব্যাংক পরিচালকবৃন্দের সরকারকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা উচিৎ।

6. সমাজ (Society)

ব্যাংক একটি আইন দ্বারা সৃষ্ট ব্যক্তি এবং সমাজেরই একজন সদস্য বলে স্বীকৃত হয়ে আসছে। ব্যাংক ব্যবসায়ের ক্ষতি না করে সমাজের চাহিদা অনুযায়ী সামাজিক ক্রিয়া কান্ডে অংশগ্রহণ করা ব্যাংক পরিচালকদের একান্ত দায়িত্ব। আমেরিকাসহ পাশ্চাত্য বিশ্বে অধুনা ভোক্তা আন্দোলনের নিরিখে ব্যবসায়ের নীতি ও সামাজিক দায়িত্ব (Business Ethics Social Responsibilities) নামক সচেতনতা গড়ে উঠেছে। ব্যাংক যেহেতু একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সেহেতু ব্যাংকের পরিচালকবৃন্দকে ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পাদনে নীতি বিসর্জন ও সমাজের প্রতি দায়িত্বহীন ক্রিয়া-কান্ডে না জড়ানোর জন্য সদা সতর্ক থাকতে হয়।

যাকে তাকে যে কোন অর্থনৈতিক ক্রিয়া-কান্তে ঋণ মারফৎ সহযোগিতা করা অনেক সময়ই সঠিক নয়। দেশের আইন ও সংবিধান বিরোধী অর্থনৈতিক ক্রিয়াকান্ত চোরা কারবারী মাদক ব্যবসায়ী, অসামাজিক কাজে নিয়োজিত ব্যবসায়ী বা দেশের শত্রুদের বৈধ অর্থনৈতিক কাজে ঋণ সহযোগিতা দিয়ে সাহায্য করা অনাকাঙ্খিত এবং ব্যবসায়ের নীতি ও সমাজের দায়িত্বের নিরিখে অবাঞ্চিত ও পরিত্যাজ্য।

ব্যাংকের পরিচালকগণ বিশ্বস্ততার সংগে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের বৈধ প্রত্যাশ্যার অবজ্ঞা না করে লাভজনক ভাবে ব্যাংক কার্যক্রমে যুগোপযোগী সঠিক নেতৃত্ব দিবেন। অন্যথায় তারা দায়িত্ব অবহেলাকারী বলে গণ্য হবেন।

 

 

ব্যাংক পরিচালকদের কার্যাবলী [ Functions Bank Directors ]:

হোন মাধ্যমে তাদের যৌথ কাজ সম্পাদন করতে পূর্ণকালীন পরিচালকবৃন্দপর্ষদের পক্ষেই বৈধ বাড়তি সুবিধার বিনিময়ে ব্যাংকের অতিরিক্ত কিছু কাজ সম্পাদন করে থাকেন। পূর্ণকালীন খন্ডকালীন উভয় বলে ব্যাংক পরিচালকবৃন্দ সাধারণত কার্যাদী সম্পাদন করে থাকেন তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিম্নরূপ:

১.  লক্ষ্য উদ্দেশ্য নির্ধারণ – Determination of the Bank’s Goals & Objectives.

২. ব্যাংকের কর্মপন্থা প্রণয়ন করা – Formulation Bank’s Policies.

৩. ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীসহ পর্যায়ে কর্মকর্তা নিয়োগ – Selection of Bank Management

৪. ব্যাংকের প্রধান কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কর্তব্য নির্ধারণ – Determining Authority Responsibilities Executives

৫. প্রয়োজনীয় কমিটি গঠন – Creating Required Committees

৬. ব্যাংকের তুলনামূলক বৃহদায়তন ঋণ তদারকি – Supervision Bank’s Relatively Bigger Loans.

৭. ব্যাংকের তুলনামূলক বৃহদায়তন বিনিয়োগ – Supervision Major Investment.

৮. কর্মকৌশল অবলম্বনে প্রধান কর্মকর্তাদের পরামর্শ প্রদান – Counselling Personnel

৯. চাহিদা মাফিক বড় বড় মক্কেলদের পরামর্শ প্রদান – Counselling the Prime Customer when Sought

১০. ব্যবসায় উন্নয়ন – Business Development

১১. ব্যাংক কার্যক্রম মূল্যায়ন পুনঃনিরীক্ষণ – Review Bank Operations

১২. কার্যবিবরণী ও কার্যের মানের নিরিখে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও সম্পাদন মূল্যায়ণ – Evaluating Performance Bank Executive and officers in the light their Descriptions and Expected Standard of Bank.

১৩. শেয়ার মালিকদের মধ্যে লভ্যাংশ অনুমোদন সুপারিশ করা – Recommendation of Dividends to be distributed to shareholders.

১৪. ব্যাংকের পক্ষে চুক্তি সম্পাদন করা – To Sign Contract on Behalf of the Bank

১৫. হিসাবপত্রের রক্ষনাবেক্ষণ করা- Maintaining Books of Records and Accounts

১৬. শেয়ার ইস্যু করা এবং বিভিন্ন শেয়ার মালিকদের মধ্যে তা বণ্টন করা- Issuing Shares and Distributing the Same Among the Share Holders.

 

 

ব্যাংক পরিচালকদের দায় [ Liabilities of the Bank Directors ]

ব্যাংক একটি কোম্পানী। ব্যাংক ও কোম্পানী আইন অনুযায়ী একজন শেয়ারহোল্ডারের দায়িত্ব শেয়ারের মূল্যমানের ভিত্তিতে সসীম।

ব্যাংক পরিচালক শেয়ার হোল্ডার হলেও তার শেয়ার মূল্যমানের বাহিরেও দায়-দায়িত্ব বহন করতে হয়।

পরিচালক পর্যদের সদস্য হিসাবে ব্যাংকের পরিচালকগণ সম্মানী সহ কতিপয় সুবিধাসী ভোগ করে থাকেন। এসব সুবিধাদীর বিনিময়ে প্রত্যেক ব্যাংক পরিচালককে কিছু প্রত্যাশিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার অভাব অথবা পুনঃ পুনঃ ভুল কার্যক্রম গ্রহণ করলে ব্যাংক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে বাধা।

যে সকল পরিচালক এরূপ ক্ষতির জন্য দায়ী তারা সাধারণত পুনরায় পরিচালক হিসাবে নির্বাচিত হন না। কিন্তু মাঝে মধ্যে বিরাটাকারের ক্ষতি সংঘটিত হলে বা আইন লংঘিত হলে, এরূপ কাজের জন্য দায়ী পরিচালক বা পরিচালকরণকে পর্ষদ সভায় সংখ্যাধিক্যের ভোটে বা সরকার তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমনকি আদালত কর্তৃক পদচ্যুত করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য যে কেবল ত্রুটিপূর্ণ কার্যক্রম নয় বরং কাজে অবহেলার কারণে পরিচালকদের দায় বহন করতে হয়।

এ সম্পর্কে সেরম্যান হেজেল-টাইন (Sherman Hzelting) নামক একজন ব্যাংক বিশারদের মতে, (“lt has been established that the director is liable not only for wrongs, but also for negligence) ব্যাংক পরিচালকদের দেশের সাধারণ আইন ও ফৌজদারী আইন উভয়প্রকার বিধান মতেই দায়ী করা যেতে পারে। যথা :

ফৌজদারী মামলার আওতায় সংগঠিত দায় সমূহ(Criminal Liabilities): যে যে জুটির জন্য ব্যাংকের পরিচালক কর্মকর্তা প্রতিনিধি বা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়ের করা যায় তার কয়েকটি নিয়ে নির্দেশ করা গেল।

(ক) ত্রুটিপূর্ণ বা ভূয়া হিসাবের লক্ষণ বা তদরাপ প্রতিবেদন পরিবেশন।

(খ) ত্রুটিপূর্ণভাবে চেক তথা অন্যান্য দলিলপত্র সনাক্ত বা সত্যায়িত করা।

(গ) চুরি, আত্মসাৎ ইত্যাদি।

(ঘ) কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে ভুয়া পরিচয়দান করে দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি করা।

(ঙ) কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহ অন্যান্য নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নিকট ভুল তথ্য পরিবেশন করা।

(চ) ব্যাংক কার্যক্রম পরীক্ষা তথ্য নির্দেশনা কর্তৃপক্ষকে ঋণ না দেওয়ার বিধান অমান্য করা।

(ছ) ওহি তহবীল (Trust Fund) থেকে পরিচালকদের ঋণ গ্রহণ না করার আদেশ অমান্য করা।

(জ) ব্যাংকের প্রয়োজনে অন্য উৎস থেকে বার গ্রহণে সহায়তা করার জন্য পরিচালক কর্তৃক কোন কি গ্রহণ না করার আদেশ অমান্য করা।

(ঝ) ব্যাংক তহবিল থেকে কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের ক্রিয়াকাণ্ডের অর্থায়ন অথবা কোন রাজনৈতিক অনুদান প্রদান না করার নির্দেশ অমান্য করা।

(ঞ) ব্যাংক তহবিল থেকে কোন লটারী, জুয়া, ভাগাখেলায় অবতীর্ণ না হওয়ার আদেশ অমান্য করা। উপরোক্ত অপরাধ সমূহের জন্য ব্যাংক পরিচালকদের জন্য আদালতে মামলা করা যেতে পারে। এবং এইরূপ অপরাধে কোন একটির জন্য অভিযুক্ত হলে ব্যাংক পরিচালকের পদচ্যুতির শান্তি সহ জেল জরিমানাও হতে পারে।

দেশে প্রচলিত সাধারণ আইন বলে দায়িত্ব অবহেলার জন্য দায় ( Common Law for ngegigence ):

প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেবল অবহেলার কারণে যে সব ক্ষতি সংগঠিত হয় এ গুলোকে সাধারণ আইন বলে পরিচালকদের দায় হিসাবে পরিগণিত হয়ে থাকে। পরিচালকদের সাধারণ যত্ন, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা নিবেদন করে গৃহীত সিদ্ধান্তের ফলেও যদি ব্যাংক বা ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বর্গ কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয় তাহলে পরিচালকদের দায়ী করা সমীচীন নয়।

এক্ষেত্রে আদালতে বা ক্ষতির সম্মুখীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠির কাছে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে পরিচালককে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের উত্তম ব্যক্তিগত যত্ন ও সতর্কতা সত্ত্বেও এরূপ ক্ষতি সংঘটিত হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে কোন ঋণ গ্রহীতা ঋণ ফেরতে ব্যর্থ হলে সেক্ষেত্রে ব্যাংক পরিচালক দায়ী হবে না। তবে এটা যদি প্রমান হয় পরিচালকদের অপ্রতুল পরিদর্শন, পর্যবেক্ষন, গাফিলভীর কারণে প্রদত্ত ঋণের অর্থ ফেরৎ আসতে ব্যর্থ হয়েছে সেক্ষেত্রে পরিচালকরা দায়ী থাকবেন।

এছাড়াও কোন পরিচালক বা পরিচালকদের ইচ্ছাকৃত পর্ষদ সভায় অনুপস্থিত হওয়ার কারণে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে যদি ব্যাংক কোন ক্ষতির সম্মুখীন হয় তাহলে সাধারণ আইন বলে দোষী সাব্যস্ত হবেন।

পরিচালকদের দায়ের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (Risk Management of Director’s Liabilities) :

ইতপূর্বে পরিচালকদের ঝুঁকির প্রকৃতি, আকার ও উদাহরণ দেয়া হয়েছে। পরিচালকদের ঝুঁকি সমূহ বিভিন্ন ভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। সাধারনত তিনভাবে এই রূপ ঝুঁকি ব্যবস্থিত হয়ে থাকে। যথাঃ

(ক) দায় উদ্ভুত হতে পারে এরূপ ক্রিয়া কান্ড থেকে এড়িয়ে চলা- Avoidance

(খ) দায় প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা Prevention and Control

(গ) ঝুঁকির দায় স্থানান্তর Transfer

(ক) দায় উদ্ভূত হতে পারে এরূপ ক্রিয়া কান্ড থেকে এড়িয়ে চলা : অর্থাৎ পরিচালক হলে দায়িত্ব পালন কালে কেউ কোন প্রকার দায় পরিগ্রহ করতে পারে জেনে কোনক্রমে পরিচালক না হওয়া। যে হবু পরিচালক তার ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যাংকে যথেষ্ট পরিমাণ সময় প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, বিবেক প্রয়োগে সুবিচার করতে অক্ষম তিনি ব্যাংকের পরিচালক না হওয়াই ব্যাংক ও তার নিজের জন্য উত্তম বিকল্প।

(খ) মায় প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা : দায় ব্যবস্থাপনার দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে ঝুঁকি সম্পর্কে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ। অর্থাৎ কি কি কাজে দায় সংগঠিত হওয়ার ঝুঁকি আছে সে কাজ বা পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্বেই ঐগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিধি বিধান সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া। এরূপ করলে এবং সতর্কতার সহিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ত্রুটি বিচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

আইন কানুনের ব্যাপারে বা দায় পরিগ্রহ হতে পারে এ ব্যাপারে নিজে দেখে শুনে নিশ্চিত না হয়ে শোনা কথা বা অলিখিত পরামর্শের উপর ভিত্তি করে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ঝুঁকি পরিগ্রহ না হওয়াই সম্ভব। উল্লেখ্য যে, ব্যক্তিগত সচিব বা বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গের দ্বারা অনেক পরিচালকবৃন্দ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে অভিযুক্ত ও অপমানিত হয়ে থাকেন।

(গ) ঝুঁকির দায় স্থানান্তর (Transfer) : উত্তম যত্ন, সাবধানতা গ্রহণ করা সত্ত্বেও কোন কোন ব্যাপারে দায় সংগঠিত হওয়া সম্ভব এরূপ দায় সম্বলিত ঝুঁকি কোন কোন বীমা কোম্পানী আংশিক ভাবে নিয়মিত প্রিমিয়ামের বিনিময়ে পরিগ্রহ করে থাকে। এরূপ ঝুঁকি বীমাকে পরিচালক তথ্য কর্মকর্তা দায় বীমা বলে অভিহিত করা হয়। পরীক্ষা করলে দেখা যাবে এটি দ্বিতীয় পর্যায়ে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি বিকল্প।

 

 

পরিচালকদের অবসর গ্রহণ [ Retirements of Directors ]:

ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের দায়-দায়িত্ব অন্য সাধারণ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশী। অতএব ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে বিভিন্ন দিকে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন লোক পরিচালক হিসাবে থাকা পর্ষদের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আবশ্যক। অধিকন্তু অভিজ্ঞতার পরিপক ও উদ্যোমে প্রবল ব্যক্তিবর্গ নিয়ে পর্বদ গঠিত হলে অভিজ্ঞতা প্রসূত চ্যালেঞ্জিং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব।

অতএব বয়স্ক পরিচালকদের একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরে সেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করার নিয়ম পাশ্চাত্যের অনেক ব্যাংকেই মেনে চলা হয়। এতে একদিকে পরিচালনা পর্ষদে নতুন মুখ আসা সম্ভব হয় এবং অন্য দিকে অতি বয়স্ক ও ভারসাম্যহীন ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে মুক্ত হয়। লেখকের মতে ৬৫ বছরের বেশী হলে ব্যাংক পরিচালককে অবসর গ্রহন করতে হয়।

আরও দেখুন:

“ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ [ Board of Directors of Bank ]”-এ 2-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন