ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]

ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]ইতিপূর্বে ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আহরণ করা হয়েছে। পুঁজি পর্যাপ্ততা নির্দিষ্ট কোন পরিমাণ সকল ব্যাংক সকল সময় নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ। পুঁজি পর্যাপ্ততার স্তর মান ও পর্যাপ্ততা পরিমাপক সূত্র সমূহ কালের গতিতে প্রয়োজনের নিরিখে পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক। এ যাবৎ সাধারণত চার ধরণের পুঁজি পর্যাপ্ততা পরীক্ষা কৌশল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যথা ক. অনুপাত ভিত্তিক পরিমাপক বা পরীক্ষা খ. ABC পরিমাপক কৌশল গ. ২০ এর নিয়ম পরীক্ষা নীতি ও ঘ. ভারযুক্ত সম্পত্তির অনুপাত।

ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]

ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]

ক. অনুপাত ভিত্তিক পরিমাপক বা পরীক্ষা :

জানামতে সর্বপ্রথম যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক রাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংক “ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম” ১৯৫০ সালে এরূপ হাতিয়ার নির্ণয় করার প্রয়াস চালিয়েছে। পরে ঋণ পত্রের মান বিশ্লেষক (Security analyst) বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সমূহ নানারকম পরিমাপকারী সূত্র নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে। সর্বপ্রথম বহু প্রচলিত যে সূত্রটি পুঁজি পর্যাপ্ততার পরিমাপক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, তা হল – পুঁজি আমানত অনুপাত [capital deposit ratio]

পরবর্তী কালে পুঁজি পর্যান্ততা পরিমাপকারীগণ সাধারণত যে চারটি অনুপাত বেশী বেশী ব্যবহার করেন তা নিম্নরূপঃ

ক) মালিকের পুঁজি মোট সম্পত্তির অনুপাত Equity Capital To Total Assets

খ) মালিকের পুঁজি ঝুঁকি সম্পত্তি Equity Capital To Risk Assets

গ) মালিকের পুঁজির মোট আমানত Equity Capital to Total Deposits

ঘ) মালিকের পুঁজি ঋণ বা Equity Capital to Loan and Discounts

উপরোক্ত বহুল প্রচলিত চারটি পরিমাপক অনুপাত ছাড়া আরও যে ৫টি পুঁজি পর্যাপ্ততা পরিমাপক অনু ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সহ ব্যাংক সাফল্যে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী ব্যবহার করে থাকেন তা নিম্নরূপ :

(১) মোট পুঁজি মোট সম্পত্তির অনুপাত- Total Capital To Total Assets

(২) ঋণ ৩ মোট পুঁজির অনুপাত Loans to total Capital

(৩) শ্রেণী বিন্যাসকৃত সম্পত্তি মোট পুঁজি অনুপাত- Classified Assets to toral Capital

(৪) স্থায়ী সম্পত্তি মোট পুঁজি অনুপাত- Fixed Assets to Total Capital

(৫) সম্পত্তির বৃদ্ধি হার-পুঁজির বৃদ্ধি হারের অনুপাত Assers Growth rate to Capital Growth Rate

যুক্তরাষ্ট্রে FDIC কর্তৃক পুঁজি পর্যাপ্ততা নিরাপক বহুল ব্যবহৃত চারটি অনুপাতের গতিধারা নিয়ে দেখা যেতে পারে।

চিত্র পুঁজি পর্যাপ্ততা পরিমাপক অনুপাত (%)

ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]

সন

মালিকের পুঁজি মোট সম্পত্তির অনুপাত

মালিকের পুঁজি ঝুঁকি সম্পত্তি অনুপাত

মালিকের পুঁজি মোট আমানত অনুপাত

মালিকের পুঁজি ঋণ ও বাট্টা অনুশ

১৯৫০

৭.৬

৯.৪

৮.৩

২১.৮

১৯৬০

৮.৪

১০.১

৯.৫

১৭.৪

১৯৬৫

৮.৩

৯.৬

৯.৪

১৪.০

১৯৭০

৭.৮

৯.১

৯.৪

১৩.৬

১৯৭৫

৬.৭

৭.৭

৮.২

১২.৭

১৯৭৮

৭.১

৮.২

৮.৯

১২.৬

১৯৮০

৭.০

৮.৭

৯.০

১৩.১

১৯৮২

৬.৮

৮.৩

৯.২

১২.৭

১৯৮৩

৬.০

৯.০

৭.৬

১০.৫

১৯৮৫

৬.২

৮.৭

৮.০

১০.৩

১৯৮৫

৬.১

৭.৫

৭.৯

১০.৩

 

উৎসঃ বার্ষিক প্রতিবেদন Federal Deposit Insurance Corporate Various Issues 1953 ব্যাংকিং পরিসংখ্যান (ওয়াশিংটন ডি. সি)

উল্লেখ্য যে ১৯৭০ সন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকারী করতিপখ তথা কম্পট্রোলারের অফিস

Controller’s Office) ফেডারেল ডিপোজিট ইন্সুরেন্স কোম্পানী উপরে উল্লেখিত নয়টি (৪+৫) পরিমাপক অনুপাত টি অনুপাত লক্ষ করা যায়।

(১) নীট সংবেদনশীল সম্পত্তি হার মোট সম্পত্তি অনুপাত-Net Rate Sensitive Assets / total Assets

(২) মোট কু-ঋণ রিজার্ভ-নীট কুঋণ অনুপাত-Reserves for change offs / Net Change –offs

(৩) নীট কুঋণ – ঋণ অনুপাত-Net Charge offs / loans

ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]

(খ) এ.বি.সি. পরিমাপক কৌশল – (ABC Measuring)

ABC এর পুরো প্রকাশ হচ্ছে “Analyzing Bank Capital মানে ব্যাংকের পুঁজি বিশ্লেষণ করণ। যুক্ত রাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড ১৯৫৬ সনে জটিল ভারযুক্ত গড় পর্যাপ্ততা পরীক্ষা ব্যবহার করে পুঁজির পর্যাপ্ততা পরিমাপ সূত্র উন্নয়ন করেন। বোর্ড প্রদত্ত সূত্র পুঁজি পর্যাপ্ততা মানও তারল্য পরীক্ষাকে সমন্বিত করে ঈঙ্গিত করে যে তারল্যের তারতম্য অনুযায়ী পুঁজি পর্যাপ্ততার পরিমান হ্রাস-বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ যে ব্যাংকের তারল্যের সম্পদ কম সে ব্যাংকের পুঁজির প্রয়োজনীয়তা বেশী। যে ব্যাংকের তারল্যের সম্পদের পরিমান বেশী সে ব্যাংকের পুঁজির প্রয়োজনীয়তা কম।
পুঁজির পর্যাপ্ততা নিরূপক এ ABC নিয়ম সম্পত্তির ঝুঁকি ভিত্তিক পুঁজির পর্যাপ্ততা শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যবহৃত হত।

গ. ২০ এর নিয়ম পরীক্ষানীতি (Rule of 20 test)

GJ Vojta নামক ব্যাংক বিশেষজ্ঞ ১৯৭৩ সনে এ ২০ নিয়ম পরীক্ষানীতি প্রবর্তন করেন। এ নীতির মধ্যে লক্ষণীয় মূল বিষয় সমূহ নিম্নরূপঃ

মুনাফা অর্জনের সন্তুষ্টি পরীক্ষা

ব্যবস্থাপনার গুনগত মানের স্তর পরীক্ষা শ্রেণীকৃত সমস্যাগ্রস্থ ঋণের পরিমাণ কোন ক্রমেই শতকরা ৫০ ভাগের বেশী হবে না।

কোন মক্কেল অথবা শিল্প বাণিজ্য খাতে ব্যাংকের সম্পদ অথবা দায় কেন্দ্রীভূত হতে পারবেনা। প্র মোট পুঁজির পরিমাণ কোন ক্রমেই মোট ঝুঁকিযুক্ত সম্পদের মোট ২০ ভাগের বেশী এবং ৫ ভাগের কম হতে পারবেনা ।

এ নীতিতে একটি অপ্রগতিশীল ব্যাংকের অতীত লোকসানের অভিজ্ঞতার আলোকে পুঁজি পর্যাপ্ততার ধারনা পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। যে যে দৃষ্টিকোন থেকে এ নীতি ব্যাংকের সম্ভাব্য লোকসানের পরীক্ষা করে তা নিম্নরূপ :

(১) ঋণ ঝুঁকি : Credit Risk

(২) বিনিয়োগ ঝুঁকি : Investment Risk

(৩) তারল্য ঝুঁকি : Liquidity Risk

(৪) পরিচালক ঝুঁকি : Operating Risk

(৫) প্রতারণা ঝুঁকি : Fraud Risk

(৬) বিশ্বাস আস্থা ভাজন ঝুঁকি : Fiduciary Risk

এ ঝুঁকি সমূহ দুইটি গ্রুপে বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। যথা ঃ

ব্যাংক পুঁজির পর্যাপ্ততা পরীক্ষা [ Test of Capital Adequacy of Bank ]

ক) সাধারণ ক্ষতি – Normal Losses

স্থিতিশীল কার্যকরী পরিবেশে এরূপ ক্ষতি সংগঠিত হতে পারে যা ব্যাংকের গতানুগতিক চলতি আয় বা মুনাফা থেকে ক্ষতি পূরন করা সম্ভব বলে ধরা হয়।

খ) অপ্রত্যাশিত ক্ষতি – Unexpected Losses

স্বাভাবিক ক্ষতির থেকে অনেক বড় ধরণের ক্ষতি সাধারণত অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থায় হয়ে থাকে। এ অপ্রত্যাশিত ক্ষতি পূরণের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজি থাকা বাঞ্ছনীয়।

সাধারণত দু’ধরনের পরীক্ষার মাধ্যমে আলোচিত ২০ এর নিয়ম পরীক্ষা নীতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। যথার

১. আয় সাফল্য পরীক্ষা [The Earning Test]

২. পুঁজি তহবিল দ্বারা সম্ভাব্য ক্ষতি পূরণের পরীক্ষা। [Test of Coverage of unanticipated Losses by Capital Funds]

আয় সাফল্য পরীক্ষা অনুযায়ী অবণ্টিত মুনাফা অবশ্যই অপ্রত্যাশিত বার্ষিক ক্ষতির দ্বিগুন হতে হবে। উল্লেখ যে, গত পাঁচ বছরের গড় লোকসানের চলমান গড়ের মাধ্যমে প্রত্যাশিত বার্ষিক ক্ষতির পরিমান নিরূপন কর হয়ে থাকে। এবং এরূপ অনুমিত ক্ষতিকে ঘটনা সাপেক্ষে দায়ের সংগে যোগ করে ঝুঁকিযুক্ত সম্পত্তির শতকরা হারে প্রকাশ করা হয়ে থাকে।

ব্যবস্থাপনার অতীত অভিজ্ঞতা ও বিচার বিবেচনা এরূপ অনুমিত সম্ভাব্য ক্ষতির সাথে সমন্বয় করে পুঁজির পর্যাপ্ততা পরিমাপ করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। অপরদিকে পুঁজি তহবি দ্বারা সম্ভাব্য ক্ষতি পূরণের পরীক্ষায় অপ্রত্যাশিত লোকসান ন্যূনতমপক্ষে ৫ বছরের চলমান ঋণ ক্ষতি রিজার্ভের গড়ের দ্বিগুন হতে হবে।

পুঁজি পর্যাপ্ততা পরীক্ষা Vojta প্রনীত ২০ এর নিয়ম পরীক্ষানীতি অনুযায়ী ঐ বিগত বছরগুলোর গড় বার্ষিক লোকসানের দিগুনের ২০ গুন পর্যাপ্ত পুঁজি বলে বিবেচিত হবে Vojta প্রণীত নীতিটি কয়েকটি জটিল দৃষ্টিকোনের অবতারণা করে পদ্ধতিটি আরও জটিল ও বিচার বিবেচনার আলোকে এ নীতি প্রয়োগ করতে ব্যক্তিগত মত ভিন্নতার কারণে নীতিটি সীমাবদ্ধতা মুক্ত বা ত্রুটি হীন বলা যাবে না। এটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশসহ বহুদেশে ব্যবহৃত হচেছ।

আরও পড়ুনঃ

মন্তব্য করুন